পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কেন বিজেপিকে ভোট নয়: একটি বিশ্লেষণ

Date:

Share post:

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এ রাজ্যে পাগলের মতো টাকা ঢেলে এবং মিথ্যে প্রচার ছড়িয়ে ইতিহাসে প্রথমবার প্রধান বিরোধী পার্টির স্থানটা নিয়ে নিয়েছিল। ব্যাপক ভোট কমেছিল বাম ও কংগ্রেসের।

২০২১ সালের বিধানসভা (ও তার ফল অনুসারে রাজ্যসভা) নির্বাচনে বিজেপি আবারও পাগলের মত টাকা ঢেলে ও মিথ্যে প্রচার চালিয়ে প্রথমবার বাংলার বিধানসভাতে প্রধান বিরোধী পার্টির জায়গাটা নিয়ে নিতে চাইছে। সে চাইছে বাম ও কংগ্রেসের জায়গাটা দখল করে নিতে।

একবার এই জায়গাটা পেলে তারপর সে চেষ্টা করবে আরও এগোতে।

এটা কোনও ভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। বিজেপির কট্টর ভোটার খুবই কম এ রাজ্যে। বেশিরভাগই ফ্লোটিং ভোটার, যারা হাওয়া দেখে ভোট দেয়। প্রচারে বিশ্বাস করে ভোট দেয়। যে বেশি টাকা ছড়ায় তার প্রচার দেখে ভেবলে যায়। গোদি মিডিয়ায় যা দেখে তাই বিশ্বাস করে। এছাড়া অন্যান্য পার্টিগুলোর ভেতরে বিশ্বাসঘাতক আছে। অন্তর্ঘাত করে, বিজেপির টাকা খেয়ে দালালি করে কিছু লোক। তলে তলে লুকিয়ে লুকিয়ে রাতের অন্ধকারে ফিস্ ফাস্‌ করে, গুজব ছড়ায়। তারা নাকি “হাওয়া” জানে।

“হাওয়া”-র চক্করে, গুজব, কানাঘুষো, ফিসফাসের চক্করে পড়ে আসামের ১৯ লক্ষ বাঙ্গালি-গোর্খা-আদিবাসীদের মতো মারাত্মক ভুল করবেন না। আপনি খোঁজ খবর নিয়ে যা ঠিক করবেন, সেটাই হাওয়া। অন্য কেউ হাওয়া ঠিক করে দেবে না। অন্তত সবথেকে ক্ষতিকারক ভাইরাস বিজেপি-কে চিনুন। মিডিয়ার কথা না শুনে কৃষকদের কথা শুনুন। মিডিয়ার কথা না শুনে ছাত্রদের কথা শুনুন। মিডিয়ার কথা না শুনে রাজনৈতিক বন্দীদের বাড়ির লোক, বন্ধু-স্বজনদের কথা শুনুন।

দেশের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিকদের বিনা বিচারে গারদে পুরল বিজেপি কার স্বার্থে? নিরপরাধ সহনাগরিকদের পিটিয়ে মারছে বিজেপি কার স্বার্থে? কোন ব্যবসা দখলের স্বার্থে? রেল থেকে বিএসএনএল থেকে এয়ারপোর্ট বেচে দিচ্ছে কার স্বার্থে? এরকম শিক্ষা নীতি বিজেপি কেন এনেছে যাতে গরীব বাড়ির ছেলেমেয়েরা ক্লাস এইটেই স্কুলছুট হয়, যাতে গ্রামের পর গ্রাম লক্ষ লক্ষ স্কুল বন্ধ হয়ে যায়, বেসরকারি পুঁজি ঢুকে পড়ে প্রতিটা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, যাতে গরিবের সন্তানের লেখাপড়ার সমস্ত সুযোগই বন্ধ হয়ে যায়? বিজেপি এমন বিল আনল যাতে দেশের সমস্ত অরণ্য, নদী, পাহাড় ধ্বংসের ছাড়পত্র পায় কর্পোরেটরা? বিজেপি-র আমলে সুপ্রিম বিচারব্যবস্থা একেবারে নাঙ্গা হয়ে গেল কেন – সর্বোচ্চ বিচারপতি বিজেপি নেতার ছেলের বাইক চেপে ঘুরছে আর একের পর এক কলঙ্কিত রায় দিচ্ছে কেন? কোভিড মহামারীকে রুখতে শুরুতেই দেশের বিমানবন্দরগুলি সীল না করে কোটি কোটি শ্রমিককে বিনা রেশনে, বিনা মাইনেয়, বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা না করে মাসের পর মাস অমানুষিক যন্ত্রণা কেন দিল বিজেপি? শ্রমিকদের কুকুর বেড়ালের মতো করে খেদাল, গায়ে ব্লিচিং স্প্রে করল, আর বড়লোকদের বেলায় সমাদরে অভ্যর্থনা, ফাইভ স্টার হোটেল?

বিজেপি-কে চিনতে হলে শেফালি হাজং-এর কথা শুনুন। আদিবাসী শেফালি হাজং অনাহারে বাধ্য হয়ে নাম মাত্র মজুরিতে নিজের হাতে বানাচ্ছেন নিজের ডিটেনশন ক্যাম্প। ক্রীতদাস হতে আর বেশি বাকি নেই তাঁর।

বিজেপি-কে চিনতে হলে ফাতিমা নাফিস-এর কথা শুনুন। ফাতিমার ছেলে নাজীবকে শুধু তার ধর্মের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গায়েব করে দিল বিজেপি। গুপ্তহত্যা করে এতদিনে নিকেশই করে ফেলেছে, কিন্তু পুলিশ, আইন, আদালত কেউ কিচ্ছু জানে না।

বিজেপি-কে চিনতে হলে রাধিকা ভেমুলা-র কথা শুনুন। রাধিকার ছেলে রোহিত ভেমুলা তার বাড়িতে প্রথম প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। সে ছেলেটি দলিত হয়ে বিজেপির বিরোধিতা করেছিল বলে তাকে হোস্টেল থেকে বের করে দিয়ে, স্কলারশিপ বন্ধ করে দিয়ে এমন অবস্থা করল যে সে আর বেঁচে থাকতেই পারল না।

বিজেপি-কে চিনতে হলে জুনেইদের মায়ের কথা শুনুন। কিশোর জুনেইদ এর অপরাধ ছিল সে পরবের দিনে বন্ধুদের সাথে ট্রেনে করে যাচ্ছিল উৎসবে আনন্দ করবে বলে। ধর্মের কারণে এক কিশোরকে পিটিয়ে মারল। মালদার শ্রমিক আফরাজুল-এর মেয়ের কথা শুনুন। আফরাজুলকে পিটিয়ে মারল রামের নাম করে। তারপর পুড়িয়ে দিল। সেই খুনিকে নির্বাচনের আগে সম্বর্ধনা দিয়ে প্যারেড করালো বিজেপি।

বিজেপি-কে চিনতে হলে আসিফা-র পরিবারের কথা শুনুন। পশুপালক যাযাবর পরিবারের ছোট্ট মেয়েকে মন্দিরের ভেতরে গণধর্ষণ করে খুঁচিয়ে মেরে তারপর জাতীয় পতাকা নিয়ে ধর্ষকদের সমর্থনে মিছিল করল বিজেপি। হাথরাসে দলিত পরিবারের মেয়েটিকে গণধর্ষণ করে পুলিশ দিয়ে প্রমাণ লোপাট করে পুড়িয়ে দিল। ধর্ষকদের সমর্থনে খাপ বসাল, মেয়েটির চরিত্রহনন করতে মিডিয়া লেলিয়ে দিল। এই হচ্ছে বিজেপি।

এতদিন যে মতুয়ারা এ দেশের নাগরিক ছিলেন, আজ সবাই বলে বেড়াচ্ছে তারা অবৈধ বাংলাদেশি। তাদেরই ভোটে জিতে এসে, তাদেরই ভোটার কার্ডকে মিথ্যে বলছে। এই হচ্ছে বিজেপি।

যে বাংলায় দেশভাগের পর কোনওদিন দাঙ্গা হয়নি। সেই বাংলায় দিকে দিকে বহিরাগতদের প্রত্যক্ষ সাহায্যে, ফেক নিউজ ও পরিকল্পিত ধর্ম-আমদানির সাহায্যে দাঙ্গা লাগিয়ে বেরাচ্ছে। মানুষ খুন করছে। দোকান, বাড়ি জ্বালাচ্ছে। ধর্মের নামে গরীব মানুষকে পেটাচ্ছে। মানুষের মনের সুন্দর দিকগুলো মুছে দিয়ে নিকৃষ্ট দিকগুলোয় হাওয়া দিচ্ছে। মাতৃভাষাকে রোজ অপমান করছে। এই হচ্ছে বিজেপি।

চার ঘন্টার নোটিসে লকডাউন করিয়ে গরীবদের ভাতে মারল। বড়লোকরা বারান্দা থেকে থালা বাজাল। আগে যখন মেয়েদের সতী সাজিয়ে পুড়িয়ে মারত তখন খুনের আওয়াজ চাপা দিতে ঠিক যেমন করে ব্রাহ্মণরা, গ্রামের পুরুষ মুরুব্বিরা ক্যানেস্তারা বাজাত। ঠিক সেরকম অশালীন ছিল মৃত্যুমিছিলের মাঝে বড়লোকদের থালা বাজানোর মহড়া। এই হচ্ছে বিজেপি।

এক রাতের নোটিসে নোটবাতিল করিয়ে আবারও গরীবদের ভাতে মারল। দুশ’ গরীব মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে মারা গেলেন। ভারতের অর্থনীতি খুচরো ক্যাশে চলে। সেই ছোট ছোট মানুষরা পথে বসল। অর্থনীতির মন্দা তখন থেকেই শুরু। আর আম্বানি আদানি টাটা থেকে শুরু করে অমিত শা’র ছেলের মত পুঁজিপতিরা ফুলে ফেঁপে উঠল। এই হচ্ছে বিজেপি।

করোনার নাম করে পি এম কেয়ার্স ফান্ড বানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ছবি লাগিয়ে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা তুলল। তাতে পুঁজিপতিদের টাকা, সরকারি সংস্থার টাকা, জবরদস্তি বেতন কেটে নিয়ে সেই টাকা, মানুষের দানের টাকা সব ঢুকল। করোনার নামে। তারপর থেকে কোর্ট কাছারি আইন আদালত করেও সে টাকার হিসেব দিচ্ছে না পাবলিককে। সৎ প্রধানমন্ত্রী সব টাকা খাবে। বিজেপির পার্টি ফান্ডে যাবে এই টাকা? হিসেব দেবে না। এই হচ্ছে বিজেপি।

লকডাউন ঘোষণার পরের দিন সব কাগজে পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন মনে আছে? চীনা কোম্পানি পে-টিমের মডেল হাসি মুখে বলছে – পেটিএম করো। নোটবাতিল জিন্দাবাদ। সেই মডেল ছিল নরেন্দ্র মোদী। এখন পাব-জি ব্যান করেও চীনা আগ্রাসনের একটি চুলও ছিঁড়তে না পারা মোদী, যার আমলে পুলওয়ামার ঘোরতর সন্দেহজনক ঘটনায় কারুর শাস্তি হয়নি, বাংলার মৃত সৈনিক বাবলু সাঁতরার স্ত্রীর জরুরি ও চোখা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাঁকে জঘন্য নোংরা কথা বলেছিল মোডিভক্ত মিডিয়া, এবং তারপর সীমান্ত পেরিয়ে কয়েকটা পাইন গাছের ওপর বোমা মেরে মিডিয়ার সাহায্যে তিলকে তাল করে ফেক ইমেজ ফাটিয়ে ইলেকশন জিতেছিল। এই হচ্ছে বিজেপি।

গ্যাসের দাম, আলু পেয়াজের দাম, চালের দাম, ডালের দাম – কোনও কিছুই এখন আর সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে না। সবই বাজারের খেলায় চলবে। মানুষ মরবে কিন্তু মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকার কিছুই করবে না। সরি, ভুল বললাম। করবে। তারা মানুষকে না খাইয়ে মারার কাজ করবে। তাই অত্যাবশ্যক পণ্যের তালিকা থেকে মানুষের শেষ সম্বল চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজও সরিয়ে নিয়েছে। এই হচ্ছে বিজেপি।

তাই বিজেপি-কে যে বা যারা ভুল কারণে ভোট দিয়েছিলেন, তারা সেই ভোট ফিরিয়ে নিন, অন্যত্র দিন বা দেবেন না বা যা খুশি করুন। *একমাত্র দেশদ্রোহী ছাড়া কেউই বিজেপিকে ভোট দেবেন না।*

 

এটি লেখকের ব্যক্তির মতামত

spot_img

Related articles

The Cow Politics Paradox: How Identity Narrative Hits Rural Farmers

As cow politics and communal polarisation intensify in West Bengal, food habits, cattle trade, and minority anxieties reveal the deep social and economic consequences of identity-driven politics in contemporary India.

“We Treat Sleep Like a Waste of Time”: Dr Haseeb Hassan on India’s Growing Sleep Crisis

Dr. Haseeb Hassan warns that treating sleep deprivation as a badge of honor is fueling a massive health crisis among India’s youth, driven by chronic stress and late-night screen exposure.

Dead at 33: Twisha Sharma, Narrative Management, and Elite Patriarchy

Twisha Sharma’s suspicious death has triggered disturbing questions about victim-blaming, elite patriarchy, and how public narratives can overshadow forensic concerns and demands for justice

‘Bulldozers, AI and Freedom of Speech’: Bengal’s New BJP Govt Faces Sharp Questions at Kolkata Roundtable

A Kolkata roundtable debated Bengal BJP government’s healthcare policies, bulldozer actions, freedom of speech concerns, minority anxieties, and AI opportunities, urging constitutional governance and inclusive development over partisan politics