পার্ক সার্কাসের বন্ধ গেটের ভেতর: বাংলায় ‘বিপুল ভোটার বাদ’ নিয়ে সপ্তাহজুড়ে বাড়ছে প্রতিবাদ

অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক ও শিক্ষাবিদরা পার্ক সার্কাসে অনির্দিষ্টকালের ধর্নার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেখানে ‘বিচারাধীন’ তকমার কারণে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার স্থগিত হয়ে গেছে। প্রবেশের ওপর নানা বাধা থাকা সত্ত্বেও আন্দোলন জোরদার হচ্ছে, কারণ বহু পরিবার অবিলম্বে ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছে

Date:

Share post:

কলকাতা: কলকাতার ঐতিহাসিক পার্ক সার্কাস ময়দান ২০২০ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেখানে এখন আবার প্রতিরোধের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তবে এবারের ক্রমবর্ধমান অবস্থান বিক্ষোভে যাঁরা অংশ নিচ্ছেন তাঁরা এক আশ্চর্য জনগোষ্ঠী— অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, অধ্যাপক এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ যাঁদের নাম ভারতীয় গণতন্ত্রের খাতা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর বিরুদ্ধে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডাকা এই ধর্না দ্বিতীয় সপ্তাহে পা দিয়েছে। এখানকার বাতাস বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণা আর আমলাতান্ত্রিক দুঃস্বপ্নের স্মৃতিতে ভারি হয়ে আছে। এই ময়দানের প্রতিবাদীদের দাবি, ভোটার তালিকার ঝাড়াই বাছাই বলে বাজারে আনা এসআইআর আসলে আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বৈধ ভোটারদের রীতিমত ছক করে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে প্রায় ৬৩.৬৬ লক্ষ নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে। আরও ৬০ লক্ষ মানুষকে বিচারাধীন তকমা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই মানুষগুলো এখন এক আইনি ধোঁয়াশার শিকার। তাঁদের নাম এখনো তালিকায় থাকলেও, আবার এক ক্লান্তিকর যাচাই প্রক্রিয়ায় পাশ করতে না পারা পর্যন্ত তাঁদের ভোটাধিকার নেই।

ময়দানে যাঁরা এখন বসে আছেন, তাঁদের মধ্যে একজন প্রাক্তন রাজ্য সরকারি কর্মচারী। তিনি বললেন ‘আমি রাজ্য সরকারের কর্মচারী ছিলাম, আমার বৈধ পাসপোর্ট আছে এবং নির্বাচন কমিশনের বলা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্তরও আছে। সেগুলো আমি শুনানিতে জমাও দিয়েছিলাম। তাও আমার নাম বিচারাধীনের তালিকায় কেন বুঝতে পারছি না।’

প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী শেখ মুনিরুদ্দিন তাঁর পরিবারের সংকটের কথা বললেন।

“ভাবতে পারেন, আমার বউয়ের নাম বিচারাধীন তালিকায় ছিল। আমরা কেসটা কলকাতায় ট্রান্সফার করিয়ে এনে শুনানির সময়ে সমস্ত কাগজপত্র জমা দিলাম। ওর নাম বিচারাধীন তালিকা থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু আমাদের পুরনো ভোট দেওয়ার জায়গায় ওর নাম মৃতদের তালিকায় তুলে দিয়েছে!”

এমনকি যাঁদের নাম এখন পর্যন্ত ভোটার তালিকায় রয়েছে, তাঁরাও আশঙ্কিত। প্রতিবাদী সাজিদ-উর রহমান বললেন ‘এই মুহূর্তে আমার নাম বিচারাধীন তালিকায় নেই। তবে যেভাবে নির্বাচন কমিশন নিজেদের সুবিধামত নোটিশ পাঠাচ্ছেন, তাতে পরের তালিকায় কার নাম এসে যাবে তার ঠিক কী?’

আরো পড়ুন দিনদুপুরে ভোট ডাকাতি?

আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সইফুল্লার নাম তাঁর আরও অনেক অধ্যাপকের মতই বিচারাধীনের তালিকায় উঠেছে। তিনিও পার্ক সার্কাস ময়দানের অবস্থান মঞ্চে আছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের নাম বিচারাধীন হওয়া বিদ্যায়তনিক ব্যক্তিদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। তাঁরা মনে করছেন যে এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষিত এবং সমস্ত কাগজপত্র থাকা ভোটারদেরও বেনাগরিক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

প্রতিবাদ করার ঝক্কি

পার্ক সার্কাস ময়দানের এই চলতি প্রতিবাদও অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে এখানে সকলে আসতে পারছিলেন, অথচ এবারে সবকটা মূল দরজায় তালা দেওয়া রয়েছে। ফলে প্রতিবাদীরা পাশের এক সরু জায়গা দিয়ে যাতায়াত করছেন। জিশানের মত কোনো কোনো আন্দোলনকারী মনে করছেন যে এটা এই আন্দোলনের বৃদ্ধি আটকে দেওয়ার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা।

তবে ব্যাপারটা বদলানোর সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পর থেকে ধর্না মঞ্চে উপস্থিতি বেড়ে গেছে। শম্পা শিরীনের নেতৃত্বে এসআইআর-বিরোধী ধর্না মঞ্চ, প্রত্যেকটি বিচারাধীন ভোটারকে তালিকায় না ফেরানো পর্যন্ত ধর্না না তোলার প্রতিজ্ঞা করেছে।

নৌশীন বাবা খান প্রায় প্রতিদিন এই মঞ্চে উপস্থিত থেকেছেন। তাঁর মতে, এসআইআর সংবিধানবিরোধী এবং গরিব, মহিলা, দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের অত্যন্ত বেশি পরিমাণে প্রভাবিত করছে। ‘অনেক বিএলও-র নামও বিচারাধীন হয়ে গেছে। এই ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া সাধারণ নাগরিককে হয়রান করছে এবং জনগণের টাকার শ্রাদ্ধ করছে।’

শিরীন উল্লেখ করলেন যে ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ বলতে যেগুলোকে বোঝানো হচ্ছে, সেগুলো প্রায়শই নির্বাচন কমিশনের নিজেদের লোকেদেরই করা ভুল। ‘আমরা এখানে ৬০ লক্ষ বিচারাধীন মানুষের জন্যে প্রতিবাদ করছি। এই মানুষগুলোকে তাঁদের ভুলই নয়, এমন জিনিসের জন্যে কেন হয়রান করা হচ্ছে? এঁদের ভোটাধিকার কেন প্রশ্নের মুখে পড়বে?’

 

এই প্রতিবেদনটি ইনিউজরুমের ইংরেজিতে প্রকাশিত মূল কাজের ভাষান্তর

spot_img

Related articles

পার্ক সার্কাসের বন্ধ গেটের ভেতর: বাংলায় ‘বিপুল ভোটার বাদ’ নিয়ে সপ্তাহজুড়ে বাড়ছে প্রতিবাদ

পার্ক সার্কাসে এসআইআর বিতর্ক ঘিরে অনির্দিষ্টকালের ধর্না জোরদার হচ্ছে। বিচারাধীন তকমায় ৬০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার স্থগিত হওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, অধ্যাপক ও পরিবারগুলি ভোটার তালিকায় নাম ফেরানোর দাবি তুলেছেন

‘Sons of the Soil’ vs Infiltration Narratives: The Hidden History Behind West Bengal’s 60 Lakh Flagged Voters

The names of more than five lakh voters have been deleted from the final electoral roll of West...

The Locked Gates of Park Circus: Inside the Growing Week-Long Protest Against Bengal’s ‘Mass Voter Deletions’

Retired veterans and academics lead an indefinite Park Circus sit-in as 60 lakh Bengalis face voter "adjudication." Despite restricted access, the movement against the ECI’s opaque SIR drive continues to surge.

Faith in the Age of Algorithms: Kolkata’s Interfaith Iftar Dissects Propaganda and Youth Radicalization

At a Kolkata interfaith iftar, leaders dissected how algorithms and propaganda shape Gen Z, warning of "Hindutva pop culture," eroding constitutional faith, and social media's role in spreading communal narratives.