এসআইআর-এর কোপে কি তবে বৈধ ভোটাররা? সরকারি কর্মী থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, বাদ পড়ছেন সবাই

তিন দশক কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি করা এক গেজেটেড অফিসারের নাম হঠাৎ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বৈধ নথিপত্র ও দীর্ঘদিনের বসবাস সত্ত্বেও বহু নাগরিক একই সমস্যার মুখে পড়েছেন। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন

Date:

Share post:

কলকাতা: রেশমা শিরীন ইকবাল তিন দশক কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ছিলেন। অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল অফ ওয়েস্ট বেঙ্গলের এই গেজেটেড অফিসার সেই ৩০ বছরে একাধিকবার নির্বাচনে মাইক্রো অবজার্ভার বা প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন, মহিলা বুথ দেখাশোনা করার মত দায়িত্ব থেকেও নির্বাচন পরিচালনার কাজ করেছেন। তাঁর বৈধ পাসপোর্ট রয়েছে এবং বহুবার বিদেশে গেছেন। এতকিছু সত্ত্বেও গত ২৮ মার্চ (শনিবার) যখন নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করল, রেশমা আবিষ্কার করলেন যে তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

রেশমার ব্যাপারটা ভারি আশ্চর্য। ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে, তখন কিন্তু তাঁর নাম ছিল। ২৩ মার্চ প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় তাঁর নাম চলে যায় বিচারাধীন তালিকায়। তারপর দ্বিতীয় তালিকায় একেবারে বাইরে। অথচ ২০০২ সাল থেকে তাঁর নাম ভোটার তালিকায় ছিল।

রেশমা জানালেন ‘আমার নাম যখন বিচারাধীন তালিকায় এল, আমাকে বলা হয়েছিল তার কারণ আমার বাবার নাম মিলছে না। কিন্তু এটা সত্যি নয়। আমার বাবার নাম জলিল আহমেদ, তিনি ছিলেন একজন ডব্লিউবিসিএস অফিসার। তাঁর নাম সমস্ত কাগজপত্রে একই আছে। তাছাড়া আমি একটা ফ্ল্যাটের মালিক, আমার কাছে একটা রেজিস্টার্ড জমির দলিলও আছে।’ তিনি আরও জানালেন যে ২০০১ সাল থেকে তাঁর পাসপোর্ট রয়েছে এবং সব প্রয়োজনীয় নথিপত্র আছে।

‘কিন্তু এখন জানি না কোথায় যাব বা কার কাছে আবেদন করতে হবে। আমাদের বিএলও-র সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম, উনি বললেন ওঁদের কিছু করার নেই। ফর্ম ৬ পূরণ করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু আমি কেন সেটা করতে যাব? ওই ফর্মটা তো নতুন ভোটারদের জন্য। যদি কোনো কারণে ওটা গৃহীত না হয়, তাহলে তো আমার ভোটাধিকার চিরকালের মত চলে যাবে,’ তিনি যোগ করলেন।

রেশমার মত, শ্যামপুরের (বিধানসভা নং ১৭৯) ভোটার, শেখ রেজাউল হকের ৬১ বছর বয়সী স্ত্রী আজমিরা বেগমেরও পাসপোর্ট আছে। তাঁর নামও সম্প্রতি প্রকাশিত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আজমিরার ছেলে শেখ আসাদ উল রহমান ভেলোর ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। তিনি বললেন ‘আমার মা বিভিন্ন নির্বাচনে ২০ বারের বেশি ভোট দিয়েছেন। আমার ছোট ভাই নেট-জেআরএফ ২০২৫-এ ৪৫ র‍্যাংক করেছে এবং এনসিএল, পুনেতে পিএইচডি করছে। আরেক ভাই বিটেক পাশ করে চাকরি করছে। মা জন্মেছিলেন বাংলাদেশের জন্মের আগে। বাংলাদেশি অভিযোগে মায়ের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে, এটা আমরা বরদাস্ত করব না। যদি দরকার হয়, আমরা মায়ের জন্যে এবং যেসব বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের জন্য রাস্তায় নামতে দুবার ভাবব না।’

অভিজিৎ মিত্র একজন নামকরা শিল্পী, যাঁর প্রদর্শনী সদ্য হয়ে গেল লন্ডনে। এই মুহূর্তে তিনিও একজন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত পিতা। তাঁর দুই ছেলে অরণ্য ও রোদ্দুরের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে।

অরণ্য কলকাতার সেন্ট জেমস স্কুলের ছাত্র ছিলেন, বিটেক পাশ করেছেন BITS থেকে এবং এমটেক পাশ করেছেন ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য থেকে। এই ৩৪ বছর বয়সী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এই মুহূর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক প্রকল্পে কাজের সূত্রে ব্রিটেনেই আছেন। রোদ্দুরও সেন্ট জেমসের ছাত্র, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এবং বেঙ্গালুরুতে কাজ করেছেন।

অভিজিৎ বললেন ’২৮ ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত তালিকায় আমার দুই ছেলেই বিচারাধীন বলে চিহ্নিত হয়েছিল। আমাকে বলা হয়েছিল আমার বাবা আর আমার বয়সের তফাত মাত্র ১৫ বছরের। অথচ আমার কাগজপত্র অনুযায়ী তফাত ৪২ বছরের। আমি যখন শুনানির সময়ে সেটা তুলে ধরলাম, তখন আধিকারিকরা স্বীকার করলেন যে এটা এআই-এর ভুল। সাম্প্রতিকতম তালিকায় আমার নাম উঠেছে, কিন্তু আমার দুই ছেলের নামই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

কলকাতা শহরের সঙ্গে তাঁর পরিবারের দীর্ঘ সংযোগের কথা বললেন অভিজিৎ ‘জানেন আমাদের এই জায়গাটার সঙ্গে কতদিনের সম্পর্ক? চারশো বছরের বেশি। আমার ছেলেরা এই শহরের পড়াশোনা করেছে শুধু নয়, দর্জিপাড়ায় নীল মিত্র স্ট্রিট বলে যে রাস্তাটা আছে সেটা আমার পূর্বপুরুষের নামে। আমরা ৩৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে দুর্গাপুজো করে চলেছি।’

তিনি অভিযোগ করলেন ‘আসলে ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, এসআইআর করা হচ্ছে মুসলমান ভোটারদের বাদ দেওয়ার জন্যে। হিন্দুরা হল কোল্যাটারাল ড্যামেজ, যেমনটা যুদ্ধের সময়ে হয়। ব্যানার্জি, চ্যাটার্জি, মিত্ররা এর মাঝে পড়ে বাদ হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের মতে আমার দুই ছেলে বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা।’

দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকার তথ্য গুরুতর সব প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মালতীপুর (বিধানসভা নং ৪৭), পার্ট নং ১২৯-এ ১,২৭৪ জন ভোটারের মধ্যে ৩৬৩ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এঁদের প্রত্যেকে মুসলমান বলে জানা যাচ্ছে। পলাশিপাড়া (বিধানসভা নং ৭৯), পার্ট নং ১৩৫-এ ২৫০ জন ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের ৯৮.৮% মুসলমান। তাঁদের অনেকেরই পাসপোর্ট রয়েছে, তবু তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় নেই।

বেশ কয়েকটা সাপ্লিমেন্টারি তালিকা বেরিয়ে গিয়ে থাকলেও কমিশন নির্দিষ্ট করে বলেনি ঠিক কতজনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যদিও সূত্রের খবর অনুসারে সংখ্যাটা বিচারাধীনদের প্রায় ৪০%। ফলে বহু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন সেই ১৫ লাখ ভোটারের কী হল, যাঁদের নাম ভোটার তালিকাতেও আসেনি, আবার বিচারাধীন তালিকাতেও আসেনি? আর যে বৈধ ভোটারদের নাম কাটা গেছে, তাঁরাই বা নিজের ভোটাধিকার ফেরাতে কোথায় যাবেন?

 

এই প্রতিবেদনটি ইংরেজি রিপোর্টের একটি অনুবাদ।

Shahnawaz Akhtar
Shahnawaz Akhtarhttp://shahnawazakhtar.com
Shahnawaz Akhtar is a senior journalist with over two decades of reporting experience across four Indian states and China. He is the Managing Editor and founder of eNewsroom India, an independent, Kolkata-based digital media platform. His work focuses on human-interest reporting, capturing lived realities, resilience, and voices often ignored by mainstream media
spot_img

Related articles

After Akbar Ali Mondal’s Killing, Pani Sol’s Hawkers Ask: How Will We Survive?

Pani Sol (Bankura): Every morning before sunrise, hundreds of bicycles and motorcycles roll out of Pani Sol village...

What Do Leander Paes, Kamran Akmal, and RF Kennedy Jr. Have in Common? It’s Not What You Think

Tennis star Leander Paes, Cricketer Kamran Akmal, and politician RFK Jr. all faced neurocysticercosis. Discover how this highly preventable, treatable brain parasite causes sudden seizures and why clean vegetables are your best defense.

The Future of INDIA Depends on Unity, Humility and Struggle

To defeat authoritarianism, the INDIA bloc must look beyond mere electoral math, embrace its diverse ideological roots, and transform political cooperation into a sustained, grassroots movement for constitutional democracy.

Up in Flames: Why 4,000 Burned EVMs Rekindled a Democratic Crisis

A devastating EVM fire in Kolkata highlights a deeper crisis in Indian democracy. More than a physical accident, it reveals how rapidly institutional trust erodes when transparency is compromised.