গীতা পাঠের অনুষ্ঠানের আক্রমণকারীদের সম্বর্ধনা দেওয়ার নিন্দা করা জরুরী

কলকাতার ব্রিগেডে গীতা পাঠের অনুষ্ঠানে ধর্মীয় কর্মসূচি রাজনৈতিক রূপ নেয়। চিকেন প্যাটিস বিক্রেতা রিয়াজুলকে হেনস্থা করা হয়। পরে অভিযুক্তরা জামিন পেয়ে প্রকাশ্যে সম্বর্ধিত হন, যা বাংলায় সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও বহুত্ববাদ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে

Date:

Share post:

গত ৭ই ডিসেম্বর, কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সনাতন সংস্কৃতি সংসদ আয়োজন করেছিল, ৫ লক্ষ কন্ঠে গীতাপাঠের অনুষ্ঠান। হাজির ছিলেন, দেশের তাবড় হিন্দুত্বের রাজনীতির মাথারা। যদিও বলা হয়েছিল, এই সমবেত কন্ঠে গীতাপাঠ একটি ধার্মিক অনুষ্ঠান, কিন্তু এই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন বাংলার বিজেপি’র প্রথম সারির প্রায় সব নেতাই। সবাই যে খুব ভক্তিভরে গীতা পড়েছেন, তা অবশ্য বলা যায় না, কিন্তু তাঁদের উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল, এই অনুষ্ঠান যত না ধর্মীয়, তার থেকে অনেক বেশী রাজনৈতিক।

সেদিন ব্রিগেড ময়দানে হাজির ছিলেন আরো বেশ কিছু মানুষ, যার অন্যতম ছিলেন আরামবাগের রিয়াজুল শেখ। আর পাঁচটা সমাবেশে যেমন প্যাটিস বিক্রি করতে যান, সেদিন ও রিয়াজুল সকাল সকাল পৌঁছে গিয়েছিলেন তাঁর টিনের বাক্স নিয়ে, যার একদিকে ছিল ভেজ প্যাটিস আর অন্যদিকে ছিল চিকেন প্যাটিস। আশা ছিল এতবড় একটা সমাবেশ হচ্ছে, নিশ্চিত ভালো বিক্রি হবে, কিন্তু তিনি জানতেন না, বা আন্দাজও করতে পারেননি, যে গীতাপাঠ গৌণ হয়ে যাবে এবং তিনি আর তাঁর চিকেন প্যাটিস আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসবেন।

ময়দানে ঐ গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে রিয়াজুল এবং আরো একজন চিকেন প্যাটিস বিক্রেতাকে যেভাবে হিন্দুবীরদের একাংশের হাতে হেনস্থা হতে হয়েছিল, তা আগে কখনো আমাদের বাংলা দেখেনি। এই ধরনের ঘটনায় অবশ্য সারা দেশ ইতিমধ্যেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, কিন্তু বাংলায় এই দৃশ্য দেখা যাবে, তা কল্পনার অতীত। গত দশ বছর ধরে, মাংস বিক্রির অপরাধে বাংলার বাইরে যে কোনও রাজ্যে কোনও সংখ্যালঘু মানুষের ওপর আক্রমণ হলে, ইদানিং আমরা বলে থাকি, ‘এ আর এমনকি’। বাংলাতেও নানান সময়ে যে কোনও হিন্দু পুজো পার্বণে নিরামিষ খাওয়ার বিধান নিয়েও একটু আধটু শোরগোল যে হয়নি, তা নয়, এমনকি বিভিন্ন আবাসনে দুর্গা পুজোতে নিরামিষ-আমিষ নিয়ে বিতর্ক হয়নি তা নয়, কিন্তু এই দৃশ্য বাংলা আগে দেখেনি। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলায় প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ আমিষাশী। সেই রাজ্যে একটি চিকেন প্যাটি ঠিক কাদের ভাবাবেগে আঘাত করেছিল, তা নিয়েও কথা বলা জরুরি, কারণ যাঁরা সেদিন রিয়াজুল সহ অন্য প্যাটিস বিক্রেতাকে আক্রমণ করেছিল তাঁরা হয়তো ব্যক্তি জীবনে অনেকেই আমিষ খেয়ে থাকেন।

অনেকেই হয়তো সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের কথা তুলে ধরবেন, অনেকেই হয়তো বলবেন যে যার নিজের রুচি অনুযায়ী খাবেন এটাই তো হওয়ার কথা, কিন্তু বিষয়টা এতটা সরল এখন আর নেই। কেউ মাংস খেলে বা মাছ খেলে, তিনি অপবিত্র হয়ে যান এই ধারণায় যাঁরা বিশ্বাস করেন তাঁদের কোনও কিছুই বোঝানো সম্ভব নয়, কারণ বিষয়টা মোটেই ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত নয়, বিষয়টা রাজনৈতিক কতৃত্বের। উগ্র গৈরিক রাজনৈতিক কারবারিরা কোনও বহুত্ববাদে বিশ্বাস করবেন, এই আশা করা অন্যায়। নিজের ভাবাবেগ আহত হলেই যে অন্যের ওপর চড়াও হওয়ার ছাড়পত্র মেলে তা নরেন্দ্র মোদীর ভারতবর্ষ রোজ বুঝিয়ে দিয়েছে গত ১১ বছরে, কিন্তু বাংলা এখনো অবধি সেই ধারায় চলেনি। সেদিনের ঘটনাতে প্রমাণিত হল আমাদের গর্বের বাংলাও ধীরে ধীরে ‘ভারত’ হয়ে উঠছে এবং বেশীদিন বাকি নেই, এই বাংলাতেও মাংস বিক্রি করার অপরাধে মুসলমান মানুষকে পিটিয়ে মারা হবে, তা আমরা দেখতে পাবো।

শুধু প্যাটিস বিক্রেতা রিয়াজুলকে মারার মধ্যেও যদি বিষয়টা সীমাবদ্ধ থাকতো, তাহলেও মানা যেত, কিন্তু বিষয়টা সেখানেই শেষ হয়নি। যেহেতু বাংলা এখনো পুরোপুরি হিন্দুত্বের রাজনীতিকে গ্রহণ করে ওঠে নি, স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই এই ঘটনার বিরোধিতা হয়েছে। যদিও যতটুকু যা বিরোধ হয়েছে, তা বিবৃতি এবং সামাজিক মাধ্যমের মধ্যেই সীমিত ছিল, কিন্তু তাও তো হয়েছে। সিপিআইএমের এক আইনজীবী, এই ঘটনা নিয়ে এফআইআর অবধি করেছিলেন। যদিও ততক্ষণে জানা হয়ে গিয়েছিল, রিয়াজুলকে কে বা কারা মূলত আক্রমণ করেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন যে নিশ্চিত করে ঐ আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হলো না, তা অবশ্য জানা নেই। তা সত্ত্বেও কলকাতা পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মাঝরাতে ঐ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ঘটনার দু’দিনের মাথায়। পরেরদিন তাঁকে পেশ করা হয় আদালতে, আর আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যায় অসংখ্য আইনজীবি ঐ অভিযুক্তদের জামিনের দাবীতে দাঁড়িয়ে পরে এবং ২৪ ঘণ্টাও তাঁদের হেফাজতে রাখতে অক্ষম হয় পুলিশ। যদি ঐ সময়টা খেয়াল করা যায়, তাহলে দেখা যাবে ঘটনা ঘটার পরে, বিজেপি দলের নেতানেতৃদের কথার মধ্যে যথেষ্ট অসংগতি দেখা গেছে। অনেকে এই ঘটনায় আক্রমণকারীর সমর্থনে ভাষ্য তৈরী করার চেষ্টা করলেও, কোনও কোনও নেতা বলেছেন, এই ঘটনায় শেষ বিচারে বিজেপি’র বাঙালি বিরোধী স্বরূপটাই প্রকাশ পেয়েছে এবং তাতে দলের ক্ষতি হয়েছে। আক্রমণকারী জামিন পেয়ে যাওয়াতে অনেকেই আবার তৃণমূল বিজেপি’র বোঝাপড়া খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু তার পরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা বিজেপির আরো একটি ভয়ঙ্কর দিক সামনে নিয়ে এসেছে, যা নিয়ে কথা বলা বেশী জরুরি।

এই গীতা পাঠের অনুষ্ঠানে প্যাটিস বিক্রেতা রিয়াজুলকে যাঁরা আক্রমণ করেছিল, হিন্দুত্ব ব্রিগেডের সেই গুন্ডাদের জামিন হওয়া মাত্র আমরা দেখতে পেলাম বাংলার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তাঁদের মালা পরিয়ে সম্বর্ধনা দিচ্ছেন, যেন তাঁরা কোনও একটা বিরাট প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। এই দৃশ্য দেখামাত্র আমাদের মনে পড়ে গেল ২০১৮ সালের ঝাড়খন্ডেও একই ধরনের একটি ঘটনার কথা। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে, তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জয়ন্ত সিনহা ঝাড়খণ্ডের রামগড়ে ২০১৭ সালে আলিমুদ্দিন আনসারির গণপিটুনিতে দোষী সাব্যস্ত আটজনকে স্বাগত ও সংবর্ধনা জানান। যেন ঐ দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখতে পেলাম আমরা, আজকের বাংলার শুভেন্দু অধিকারীর কার্যকলাপের মধ্যে। সেদিন ওই ব্যক্তিরা একটি হিন্দু জনতার অংশ ছিল যারা আনসারিকে গরু জবাইয়ের সন্দেহে এবং গোমাংস রাখার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করেছিল। ঘটনাচক্রে জয়ন্ত সিনহা যেদিন ঐ সম্বর্ধনা দিচ্ছিলেন, সেদিনই অন্য একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, গোরক্ষার অজুহাতে কোনও ব্যক্তিকে হত্যা করা একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়

হাজারিবাগের সাংসদ জয়ন্ত সিনহা’র বক্তব্য ছিল তিনি ঐ সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করছিলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে তাদের দোষী সাব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও, তাঁরা কাউকে হত্যা করেছে এমন “কোন প্রমাণ” নেই। জয়ন্ত সিনহা’র এই আচরণটি ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তাঁকে এবং বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা প্রচার এবং ধর্মীয় মেরুকরণকে উস্কে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। রাহুল গান্ধী থেকে দীপঙ্কর ভট্টাচার্য সেদিন ঐ ঘটনার নিন্দা করেছিলেন দ্যর্থহীন ভাষায়।

আজকে যখন বাংলায় গীতা পাঠের অনুষ্ঠানে এক দরিদ্র প্যাটিস বিক্রেতাকে আক্রমণ করা হয়, এবং অভিযুক্তদের প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, এবং তাঁদেরকেই আবার সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছে, তখন প্রশ্ন উঠছে, এবার তো কোনও নাগরিক সমাজ বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে নিন্দা করা হয়নি, তাহলে কি বাংলাতেও এই মাংস রাখার অপরাধে, বা সাধারণ চিকেন প্যাটিস বেচাটা বেআইনি? নাকি সংখ্যালঘুদের পিটিয়ে মেরে ফেলাই এখন এই বাংলার ও অঘোষিত আইন? আসলে এই ঘটনাটা কখনোই এখন আর রাজনৈতিক ঘটনা নয়। আইনী লড়াই করেও এই লড়াই জেতা সম্ভব নয়। এই সমস্যাটা এখন এক সামাজিক সমস্যায় পর্যবসিত হয়েছে এবং সেইজন্যেই শুভেন্দু অধিকারীর আচরণকেও সমালোচনা করতে হবে।

শুধু সমালোচনা করলেই অবশ্য কাজটা শেষ হয়ে যাবে না, আমিষ নিরামিষ নিয়ে বিতর্কটা সামাজিক স্তরেও নিয়ে যেতে হবে। বোঝাতে হবে যে বিজেপি আরএসএস সমস্ত কিছুকে একটা সমস্বত্ব চেহারা দিতে চায়, অথচ ভারতবর্ষ তো বহুত্ববাদের কথাই বলে

Suman Sengupta
Suman Sengupta
An Engineer by profession & social worker. Writes regular columns in Bengali newspapers & web magazines.

Related articles

BRICS Isn’t Beijing’s Game. It’s India’s Strategic Autonomy

India’s BRICS engagement is not about choosing China over the West but protecting its strategic autonomy. As the global order turns multipolar, India must retain strong ties across competing blocs while defending its independent foreign policy and ensuring that national interests, not Western approval, shape its international choices.

Eight Intelligences, One Report Card: The Flawed Machinery of Academic Merit

Howard Gardner’s multiple intelligences theory challenges the obsession with grades, but India’s education system continues to reward a narrow definition of merit. As academic pressure grows, students face mounting expectations, anxiety and mental-health struggles, raising questions about how we define intelligence, success and failure

From the Moon to the Manhole: Can India’s Tech Revolution Finally Dignify Its Sewers?

India has sent missions to the Moon, yet sanitation workers still risk their lives inside sewers. At Durgapur, CSIR-CMERI is developing mechanised cleaning technology that could replace dangerous human entry, prevent deaths and help end the generational stigma attached to manual scavenging.

Across Time Zones and Election Trails: The Sudivya Sonu I Knew

Sudivya Sonu was more than a politician I covered. He was someone I knew as a voter, journalist and friend. Across two decades, cities, elections and time zones, our conversations continued—until a final speech, a promised meeting and a sudden loss changed everything